ভারতে অন্তঃসত্ত্বা মুসলিম নারীদের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ গর্ভবতী হাতির জীবন

 


ভারতের দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ বছর বয়সী এমফিল গবেষক সাফুরা জারগার। গত ১০ এপ্রিল দুপুর আড়াইটার দিকে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার নিয়ন্ত্রিত দিল্লী পুলিশের বিশেষ শাখার একদল সদস্য তার বাসায় গিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। জারগারের স্বামী জানান, পুলিশ গিয়ে তার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। গ্রেফতার করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। তাঁর বিরুদ্ধে আঠারোটি মামলা করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে হিংসা ছড়ানোর পাশাপাশি, অশান্তি, অস্ত্র দখল, হত্যার চেষ্টা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা। গ্রেফতারের সময় সাফুরা গর্ভবতী ছিলেন। তিনি এখন ২২ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। জেলে পাঠানোর পর থেকে গত দীর্ঘ দুইমাস ধরে কাশ্মীরি মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম দুই নক্ষত্র শহীদ আফজাল গুরু এবং শহীদ মকবুল বাটের স্মৃতিবিজড়িত দিল্লির তিহার জেলে বন্দী রয়েছেন সাফুরা। একেতো প্রাণঘাতী করোনা তারউপর এই জেলে এখন বন্দীদের উপচে পড়া ভীড়।

১৯৯৩ সালে কাশ্মীরের কিস্তওয়ার এলাকায় জন্ম নেওয়া সাফুরা জারগর হিজাবী নয়, প্রাক্টিসিং মুসলিমও নয়, কোন জঙ্গি(!) সংগঠনের সাথেও সংশ্লিষ্ট নয়। তার একমাত্র অপরাধ সে মুসলিম এক্টিভিস্ট। অন্যদের মতো চুপ না থেকে হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকারের সাম্প্রদায়িক নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছিল। সাফুরা জারগর মানুষের মধ্যে বিভেদের বিরুদ্ধে ছিল। গণমানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিল। সে শান্তিপূর্ন প্রতিবাদেই বিশ্বাসী ছিল। যে আইন মানুষে মানুষের বিভেদ ছাড়াতে পারে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। সাফুরা দেখিয়েছিল মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হল প্রতিবাদ। কোন ভয় বা হুমকিতে কখনও তা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। কিন্তু ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ভারত তার উপর নির্যাতন-নিষ্পেষণ চালিয়ে এটাই প্রমাণ করেছে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তারা তাদের সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাদের পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর বিভেদ ছড়াতে। এছাড়াও বিজেপি-আরএসএসের অনলাইন এক্টিভিস্ট নামক ইসলামোফোব দুর্বৃত্তরা সাফুরা জারগরকে নিয়ে বানোয়াট কেচ্ছা-কাহিনীর সাথে ফেইসবুক-টুইটার-ইউটিউবে বিভিন্ন কাটছাঁট করা আপত্তিকর দৃশ্যও ছড়িয়ে যাচ্ছে একাধারে। কি জঘন্য মনমানুষিকতা এদের!



ভারতে কিছুদিন আগেও গর্ভবতী একটি হাতির মৃত্যুতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল; অথচ যেখানে বারবার এই অন্তঃসত্ত্বা সাফুরার জামিন নাকচ করে দিয়ে তাকে একটি অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী মোদী প্রশাসন মহামারীর পরিস্থিতিতে ভারতবাসীদের বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করছে বারবার, সেই সময়ে আরেক অন্তঃসত্ত্বাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে জনবহুল কারাগারের অন্ধকারে।

এই প্রতিবাদ বিক্ষোভের সূত্রপাত এবং বিক্ষোভ পরবর্তী সহিংসতা সম্পর্কে বিবিসি জানাচ্ছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে দিল্লির উত্তর-পূর্ব প্রান্তে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় অন্তত ৫৩জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলিম।
তার ঠিক আগে শহরে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদ চলছিল – এবং পাশাপাশি বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরাও প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে নানা উসকানিমূলক বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছিলেন।
মানবাধিকার আইনজীবী কলিন গঞ্জালভেস জানাচ্ছে, "দাঙ্গার সময় পুলিশের বিরুদ্ধেই মারধর, অগ্নিসংযোগ বা ভয় দেখানোর অন্তত আশি-নব্বইটা অভিযোগ এসেছে, কিন্তু পুলিশ একটারও এফআইআর নিতে রাজি হয়নি। আর ভিক্টিমদের বয়ানের ভিত্তিতে নয়, পুলিশ তদন্তটা সাজিয়েছে তাদের বানানো গল্প আর সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। অথচ আমরা সবাই জানি দাঙ্গার মূলে ছিল বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদের ঘৃণা ছড়ানো ভাষণ!"
সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্ট সারা নাকভিও বলছিলেন, "বেশির ভাগ টিভি চ্যানেলের ন্যারেটিভে যেভাবে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের দেশদ্রোহী সাজানো হয়েছে – দিল্লি পুলিশও ঠিক সেই লাইনেই তদন্ত করেছে।"

অর্থাৎ, তারা সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার কেড়ে নিবে। তারা প্রতিবাদ করলে আক্রমণ করবে, হত্যা করবে। আর যারা বেঁচে থাকবে তাদের জেলে পুরবে।

উল্লেখ্য, জারগারের মত আরো অনেক মুসলিম ছাত্র-কর্মী রয়েছেন যারা ২৫ মার্চ ভারতজুড়ে লকডাউনের পর থেকে কারাগারে আছেন। অন্যদিকে দিল্লির রাস্তায় শাহিনবাগের আন্দোলনকারীদের উপর প্রকাশ্যে গুলি ছুঁড়েছিল যে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী, সেই কপিল গুজ্জারকেও জামিন দেওয়া হয়েছিল মাত্র ২৫ হাজার টাকায়। অথচ বন্দি রয়েছেন আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীরা। বিচার ব্যবস্থার এই মেরুকরণ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো কি স্পষ্ট দ্বিচারিতা নয়? মুসলিমবিদ্বেষ নয়?

Comments

Popular posts from this blog

Midnight Massacre in Dhaka by Security Forces of Bangladesh [WARNING GRAPHIC VIOLENCE]

অনলাইনে নারীবাদী এক্টিভিস্ট আর অফলাইনে ধর্ষকের সহযোগী!

শাহবাগী ফ্যাসিবাদী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট সংগঠন গুলোর তালিকা