সন্ত্রাসবাদীদের ইন্ধনে মধ্যপ্রাচ্যের 'নরককুণ্ড সিরিয়ার' পথে লিবিয়া

 

সন্ত্রাসবাদীদের ইন্ধনে মধ্যপ্রাচ্যের 'নরককুণ্ড সিরিয়ার' পথে লিবিয়া

AddThis Sharing Buttons
Share to WhatsAppShare to LinkedInShare to আরও...


লিবিয়া উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। লিবিয়ার উত্তরে ভূমধ্যসাগর, পূর্বে মিশর, দক্ষিণ-পূর্বে সুদান। ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত ত্রিপোলি শহর লিবিয়ার বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।
২০১১ সালে ন্যাটোর হস্তক্ষেপে কতৃত্ববাদী শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফীর পতনের পর লিবিয়ায় যে বহুমুখী সঙ্কট শুরু হয়েছে তা সম্ভবত এইবার ব্যপক রূপ নিতে শুরু করেছে। গাদ্দাফির মৃত্যুর পর লিবিয়া এখন একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। বিপর্যস্ত অবস্থায় পরিণত হয়েছে অর্থনীতি। তেল উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। লিবিয়ায় আগে থেকেই মিলিশিয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা ছিল, সেটি এখন প্রকট হয়েছে। গাদ্দাফি প্রশাসনের পতনের পর লিবিয়ার সর্বত্র বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সবার হাতে হাতেই অত্যাধুনিক মরণাস্ত্র।

লিবিয়ায় এ মুহূর্তে দুটি পরস্পরবিরোধী প্রশাসন সক্রিয় আছে: একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতিসংঘ স্বীকৃত প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল সেরাজ এবং অন্যটি ওয়ারলর্ড খ্যাত জেনারেল খলিফা হাফতারের বিদ্রোহী বাহিনী। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও ত্রিপোলি ভিত্তিক গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকোর্ড (জিএনএ) কে হঠাতে মধ্যপ্রাচ্যের বিষপোড়া আরব আমির‍্যাটস, রাশিয়া, সৌদি, জর্দান, ফ্রান্স ও মিশর একজোট হয়েছে গাদ্দাফির সাবেক কমান্ডার খলিফা হাফতারের পক্ষে। হাফতার নিয়ন্ত্রিত এই জোট লিবিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনী বা (এলএনএ) নামে পরিচিত। এখানে ঐক্যবদ্ধ হওয়া একেক দেশের স্বার্থ ভিন্ন। কেউ জোট বেধেছে নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষায়, কেউ জোট বেধেছে জিএনএ তে সক্রিয় ইসলামপন্থীদের ঠেকানোর জন্য আবার কেউবা বন্ধু হাফতার কে রক্ষায়। যদিওবা হাফতারের পক্ষে মাঠে লড়াই করছে লিবিয়ানরা এরসাথে সুদান থেকে আগত হাজারো ভাড়াটে যোদ্ধারা।

অন্যদিকে 'জিএনএ' হলো আমাদের দেশের ক্যাঙ্গারু ট্রাইব্যুনালের মতো নামেমাত্র 'আন্তর্জাতিক'। তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে পুরো লিবিয়ার এক তৃতীয়াংশেরও কম এলাকা। যদিওবা লিবিয়ার জনসংখ্যার অধিকাংশই তাদের নিয়ন্ত্রাধীন এলাকায় বাস করে। কিন্তু তুরস্ক ও কাতার ছাড়া তাদের আন্তর্জাতিক কোন মিত্র না থাকায় তুর্কী হস্তক্ষেপের আগপর্যন্ত শধুমাত্র রাজধানী ত্রিপলিতেই তাদের কোণঠাসা করে ফেলেছিল হাফতারের বাহিনী। যাদের নিয়ন্ত্রণে আবার লিবিয়ার অধিকাংশ তেলক্ষেত্র গুলো। এদিকে হাফতার পুরো লিবিয়া দখলের অভিপ্রায়ে কয়েকমাস আগে রাজধানী ত্রিপোলীতে হামলা চালানো শুরু করলে ভয়াবহ লড়াই বাঁধে। যে লড়াইয়ে শত শত মানুষ প্রাণ হারায়। অন্যদিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়াতে ও বিশ্বের মোড়লদের কাছ থেকে জিএনএ জোট কোনপ্রকার সাহায্য সহযোগীতা না পেয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তুরস্কের সাথে সামরিক চুক্তি করে সেদেশের সামরিক হস্তক্ষেপ কামনা করে। এবং খুবই তড়িঘড়ি করে তুরস্কও গত ৫ জানুয়ারি থেকে জিএনএ প্রধান ফায়েজ আল–সাররাজের আমন্ত্রণে লিবিয়ায় তুর্কি সৈন্য এবং তুর্কি–সমর্থিত সিরীয় মার্সেনারিদের মোতায়েন করতে আরম্ভ করে।

যদিওবা তুরস্কের এই সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টিকে বিশ্লেষকরা বিভিন্ন আঙ্গিকে দেখছেন, কেউ দেখছেন এরদোয়ানের 'অটোমান সম্রাজ্যের পুনরোত্থানে' সোমালিয়া, কাতার সহ কয়েকটি রাষ্ট্রে সামরিক ক্যম্প নির্মানের যে অভিপ্রায় তার অংশ হিসেবে।
কেউ আঞ্চলিক প্রতিদন্ধিদের মোকাবেলা ও লিবিয়ায় নিজেদের প্রভাবাধীন সরকার প্রতিষ্টার চেষ্টা হিসেবে।
অনেকেই মনে করছেন 'লিবিয়ায় রয়েছে বিশ্বের ৯ম বৃহত্তম খনিজ তেলের মজুদ। তুর্কি অর্থনীতিতে জ্বালানির প্রচুর চাহিদা রয়েছে এবং তুরস্ক তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির প্রায় তিন–চতুর্থাংশ বাইরে থেকে আমদানি করে। লিবিয়ায় তাদের সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে তাই লিবিয়ায় এই তুর্কি হস্তক্ষেপ।'
অন্যদিকে, লিবিয়ায় যে হাজার কোটি ডলারের তুর্কি ইনভেস্ট আছে তা রক্ষার্থেও এই হস্তক্ষেপ বলে অনেকে অভিমত দিয়েছেন।
আবার জিএনএ জোটে সক্রিয় আছে একেপির আদর্শিক মিত্র মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ ইসলামী মুভমেন্ট মুসলিম ব্রাদারহুডসহ ইসলামপন্থীরা। যাও তুরস্কের এই হস্তক্ষেপে প্রভাব রেখেছে বলে অনেক বিশ্লেষক অভিমত দিয়েছেন।





তুরস্কের হস্তক্ষেপের পরপরই এই ক'মাসে অভূতপূর্ব ভাবে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে শুরু করেছে। তুরস্কের অপ্রতিরোধ্য ড্রোনের সহযোগীতায় জিএনএ জোট একের পর এক এলাকা পুনোরুদ্ধার ও দখল করতে শুরু করে হাফতার বাহিনীর কাছ থেকে। গত সপ্তাহখানেক ধরেই তুর্কি ড্রোন আমিরাতের অর্থে হাফতারকে সরবরাহ করা রাশিয়ান পান্তসির এস-১ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের বেশ কয়েকটি ইউনিট গুড়িয়ে দেয়। একেকটি পান্তসীরের দাম ১৫ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভালোই ধকল গেছে হাফতার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের উপর গত এক সপ্তাহে। সর্বশেষ গত পরশুদিন তুর্কি ড্রোনের উপর্যুপুরি হামলায় জিএনএ জোটের অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ 'আল ওয়াতিয়া' এয়ারবেস দখল ছিল হাফতারের ত্রিপোলি দখলের স্বাধ মাটি হয়ে যাওয়া!

এদিকে অন্যান্য ভীরু ও পরনির্ভরশীল শাসকগোষ্ঠীর মতো হাফতারও একের পর এক এলাকা হাতছাড়া হতে দেখে তুরস্ক ও জিএনএ জোটের প্রতি ব্যাপক হুমকি ধামকি ও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সিভিলিয়ানদের উপর গ্রেনেড ছুঁড়ে যাচ্ছে। গত কিছুদিন আগেই হাফতার বাহিনীর মিসাইল হামলায় ত্রিপোলিতে পাঁচ বছর বয়সী বাংলাদেশী এক শিশুও মারা যায়। তার বাবা মাও গুরতর আহত হয় এই হামলায়।

আরব বসন্তের আঁচ নিজেদের ক্ষমতায় এসে লাগে কিনা এই চিন্তায় অস্থির সৌদি ও আরব আমির‍্যাটসের শাসকগোষ্টি যেভাবে মিশর,তিউনেশিয়া ও সুদানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ ক'টি দেশে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাদের পা-চাটা শাসকবর্গকে বসিয়েছে সেই একইরকম হস্তক্ষেপ করতে এসে লিবিয়ায় তুর্কি প্রতিরোধে এখন যা-তা অবস্থা। তাদের চিরশত্রু রাশিয়াও এখানে তাদের দলে ভিড়েছে। যারা সিরিয়ায় বছরের পর বছর স্বৈরশাসক আসাদকে রক্ষায় ইরানের সাথে মিশে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে। যেখানে গত এক দশকে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ, যেই সংখ্যাটা তাদের দেশের মোট জনসংখ্যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। বাস্তুচ্যুত হয় এক কোটি মানুষ ও কারাবন্দী ৫ লাখ সিরিয়ান এখনো মানবেতর জীবন যাপন করছে। এখন সেই মানবখেকো সন্ত্রাসীরা তাদের মরণাস্ত্র গুলো লিবিয়ানদের উপর বর্ষণের মধ্য দিয়ে সফলতা পরীক্ষা করতে আবারো সেই একইরূপে হাজির হয়েছে লিবিয়ায়। আজ ইসরাইল দাবী করেছে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রধানতম মিত্র ইরানও নাকি হাফতারের পক্ষে এন্টি ট্যাংক মিসাইল প্রেরণ করেছে লিবিয়ায় !

অন্যদিকে আজকেই রাশিয়া তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরী অত্যাধুনিক ছয়টি মিগ-২৯ ও ২ টি সুখোই-২৪ যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে যুদ্ধবাজ হাফতারকে খাঁদের কিনার থেকে রক্ষা করতে!

স্বাভাবিক ভাবেই এই সংঘাতটা আরো জোরালো থেকে জোরালো হতে যাচ্ছে। একদিকে আছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়া, ফ্রান্স ছাড়াও মিশর, সৌদি ও আরববিশ্বের ইজরাইল খ্যাত আরব আমির‍্যাটস এবং অন্যদিকে লিবিয়ার বৈধ শাসকগোষ্ঠী জিএনএ, আভ্যন্তরীণ ঝামেলা ও মরণঘাতি করোনায় জর্জরিত তুরস্ক ও সদ্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বিদ্বেষপূর্ণ অবরোধ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কাতার। তবে কি লিবিয়ায় আরেকটি 'সিরিয়া যুদ্ধ' আসন্ন?

লিবিয়ায় চলমান সংঘাতের লাইভ আপডেট ও কোন জোট কত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে তা প্রতিমুহূর্তে দেখতে পারেন এই সাইটে

Comments

Popular posts from this blog

Midnight Massacre in Dhaka by Security Forces of Bangladesh [WARNING GRAPHIC VIOLENCE]

অনলাইনে নারীবাদী এক্টিভিস্ট আর অফলাইনে ধর্ষকের সহযোগী!

শাহবাগী ফ্যাসিবাদী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট সংগঠন গুলোর তালিকা